ময়মনসিংহের ফুলপুরের রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাঙ্গনের এক সুপরিচিত ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব, ফুলপুর ডিগ্রি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এবং বৃহত্তর ফুলপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সারোয়ার জাহান শাহীন আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বহুমুখী গুণের অধিকারী এই নীতিবান রাজনীতিক ও শিক্ষানুরাগীর আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ডায়াবেটিসজনিত শারীরিক জটিলতায় ভুগে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার (২০ জুলাই) বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি পিতা -স্ত্রী ও দুই পুত্র সন্তানসহ বহু আত্মীয়-স্বজন, রাজনৈতিক সহকর্মী ও অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন।
সারোয়ার জাহান শাহীন ছিলেন একাধারে কারানির্যাতিত ত্যাগী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, আদর্শ শিক্ষক, সৎ ব্যবসায়ী এবং অসামান্য সামাজিক গুণের অধিকারী একজন সাদা মনের মানুষ। নিচে তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের নানা স্মরণীয় দিক তুলে ধরা হলো:
১. আপসহীন নেতৃত্ব ও রাজপথের লড়াকু সৈনিক
ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন সারোয়ার জাহান শাহীন। ফুলপুর ডিগ্রি কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস এবং উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮০-এর দশকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ফুলপুরের রাজপথে তিনি সাহসিকতার সাথে প্রথম সারিতে নেতৃত্ব দেন। রাজপথের এই লড়াইয়ে তিনি একাধিকবার গ্রেফতার হন, রাজনৈতিক মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে কঠিন কারানির্যাতন ভোগ করেন। তবুও কোনো ভয় বা প্রলোভন তাঁকে আদর্শচ্যুত করতে পারেনি।
২. দুর্দিনের কাণ্ডারি ও নিঃস্বার্থ রাজনীতি
আওয়ামী লীগের কঠিন ও দুর্যোগপূর্ণ সময়ে তিনি ফুলপুরের রাজনীতিতে এক বিশ্বস্ত নাম ছিলেন। তৎকালীন ফুলপুর-তারাকান্দা আসন থেকে ৫ বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য, ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম এম শামসুল হকের অন্যতম ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন সহচর ছিলেন তিনি। শত ত্যাগ, কারাবরণ ও অবদান থাকা সত্ত্বেও দলের সুদিনে তিনি কোনো মূল্যায়নের আশা করেননি; নিরহংকারী থেকে রাজপথের সহযোদ্ধা হিসেবেই জীবন পার করেছেন।
৩. শিক্ষাবিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা
রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান ছিল চিরস্মরণীয়। রূপসী ইউনিয়নের পাগলা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। স্কুলটি প্রতিষ্ঠার পর শুরু থেকেই তিনি সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এলাকার আলো ছড়ানোর কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেছিলেন।
৪. কর্মজীবনে সততা ও সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা
শিক্ষকতার পর কর্মজীবনেও তিনি সততার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। পরবর্তীতে তিনি ‘গ্রীন এগ্রোটেক লিমিটেড’-এর বৃহত্তর ফুলপুর এলাকার মার্কেটিং অফিসার হিসেবে সুনাম ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করেন। ব্যবসায়িক ও কর্মক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও নীতিবান।
৫. অকৃত্রিম ভালোমানুষি ও সজ্জন ব্যক্তিত্ব
এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণকারী সারোয়ার জাহান শাহীনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর সহজ-সরল জীবনযাপন ও অমায়িক ব্যবহার। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক মানুষের সাথে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। জীবনে কখনো স্বেচ্ছায় কাউকে আঘাত করেননি। অহংকারহীন এই মানুষটি সর্বমহলে একজন খাঁটি ‘সাদা মনের মানুষ’ হিসেবে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র ছিলেন।
অশ্রুসিক্ত বিদায় ও জানাজা:
মরহুমের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তিনি ফুলপুর উপজেলার রূপসী ইউনিয়নের পাগলা গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। সোমবার সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে তাঁর চিরচেনা ও প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—পাগলা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
মরহুমের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাঙ্গনের নেতৃবৃন্দ সহ সর্বস্তরের হাজার হাজার মানুষ জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। জানাজা শেষে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
তাঁকে হারিয়ে ফুলপুরবাসী এক অভিভাবক ও ত্যাগী নেতাকে হারালো। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।