ঢাকার ভাসানটেকে এক সেনা কর্মকর্তার শ্বশুরের বাসায় সুমি আক্তার (৯) নামের এক শিশু গৃহকর্মীকে টানা ১৪ মাস আটকে রেখে হাত ভেঙে দেওয়া, দা-খুন্তির ছ্যাঁকা ও গরম পানি ঢেলে অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। গত ৫ জুলাই নির্যাতনের শিকার শিশুটি ওই বাসা থেকে কোনোমতে পালিয়ে আত্মরক্ষা করে। বর্তমানে সে ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
নির্যাতিত সুমি আক্তার ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার ১০ নম্বর বিসকা ইউনিয়নের বিসকা গ্রামের হতদরিদ্র দিনমজুর সিদ্দিক মিয়ার মেয়ে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, চরম অভাবের তাড়নায় দিনমজুর সিদ্দিক মিয়া তাঁর শিশুসন্তান সুমিকে ভালো রাখা ও পড়াশোনা করানোর আশায় স্থানীয় এক নারীর মাধ্যমে ময়মনসিংহ সেনানিবাসে কর্মরত আলমগীর হোসেন নামের এক সৈনিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আলমগীর হোসেন আশ্বাস দিয়েছিলেন—সুমিকে পড়াশোনা করানো হবে এবং এক সেনা কর্মকর্তার শিশুর দেখভালের দায়িত্বে রাখা হবে।
কিন্তু আলমগীর হোসেন সুমিকে ময়মনসিংহে না রেখে ঢাকার সাইফুল ইসলাম নামের এক আর্মি মেজরের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে দেন। পরবর্তী সময়ে তাকে ওই কর্মকর্তার শ্বশুর দেলোয়ার হোসেনের ঢাকার ভাসানটেক মাটিকাটা এলাকার বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের মে মাস থেকে ২০২৬ সালের ৪ জুলাই পর্যন্ত দীর্ঘ ১৪ মাস সুমিকে ওই বাসায় বন্দি জীবন কাটাতে হয়। এই দীর্ঘ সময়ে তাকে বাবা-মায়ের সঙ্গে একবারের জন্যও দেখা বা কথা বলতে দেওয়া হয়নি।
অভিযোগে জানা যায়, ভাসানটেকের ওই বাসায় তিনটি শিশুকে দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ৯ বছরের শিশু সুমিকে। শিশুরা কাঁদলে বা রান্না ও ঘর মোছার সামান্য ত্রুটি হলেই গৃহকর্তা দেলোয়ার হোসেন এবং গৃহকর্ত্রী মনিরা ফেরদৌসী অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে গরম দা ও খুন্তি দিয়ে সুমির শরীরের বিভিন্ন অংশে ছ্যাঁকা দিতেন। মাঝেমধ্যে তার শরীরে গরম পানিও ঢেলে দেওয়া হতো।
একপর্যায়ে জানালার গ্রিলের চিপায় ফেলে সুমির দু’হাতের আঙুল ভেঙে দেওয়া হয়। সুমি ব্যথায় ও ভয়ে কান্নাকাটি করলে তাকে মেরে ফ্রিজে রেখে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো এবং একাধিকবার গলা টিপে হত্যার চেষ্টাও করা হয়। সুমির মাথা, গলা, হাত, পা, পেট ও পিঠসহ সমস্ত শরীরে এখনও অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন এই নির্মমতার সাক্ষ্য দিচ্ছে।
গত ৫ জুলাই সকালে কোনোমতে ওই বাসা থেকে পালিয়ে বের হয়ে আসে সুমি। সুমি পালিয়ে যাওয়ার পর গৃহকর্তা দেলোয়ার হোসেন সুমির বাবার মোবাইলে ফোন করে জানান যে মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খবর পেয়ে সুমির বাবা-মা দ্রুত ঢাকায় ছুটে আসেন এবং অনেক খোঁজাখুঁজির পর সুমিকে উদ্ধার করে গ্রামের বাড়ি তারাকান্দায় নিয়ে যান।
ভয়ার্ত কণ্ঠে সুমির বাবা সিদ্দিক মিয়া বলেন:
”আমরা গরিব মানুষ। সুমিকে পড়াশোনা করাবে বলে ওরা নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারা আমার ৯ বছরের বাচ্চার শরীরটা ছ্যাঁকা দিয়ে শেষ করে দিয়েছে, আঙুলগুলো ভেঙে দিয়েছে। আমি এই নিষ্ঠুর নির্যাতনের সুষ্ঠু বিচার চাই।”
একটি ৯ বছরের শিশুর ওপর এমন মানবাধিকার লঙ্ঘন ও পাশবিক নির্যাতনের ঘটনায় তারাকান্দা ও স্থানীয় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। স্থানীয় এলাকাবাসী ও মানবাধিকার কর্মীরা এই ঘটনার সাথে জড়িত দেলোয়ার হোসেন, মনিরা ফেরদৌসী এবং সহায়তাকারী আলমগীর হোসেনসহ দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।