দেশের তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষার মেরুদণ্ড হলো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি নীরব সংকট এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। একই এলাকায় বা নিজ উপজেলায় বছরের পর বছর, এমনকি পুরো চাকরিজীবন পার করে দেওয়ার সুযোগ থাকায় তৈরি হচ্ছে একশ্রেণির শিক্ষকের শক্ত সিন্ডিকেট। এই প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা ভাঙতে এবং শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে এখন সময়ের দাবি—প্রতি তিন বছর অন্তর শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক অন্যত্র বদলি করা এবং নিজ উপজেলায় নিয়োগ বন্ধ করা।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সচেতন মহলের মতে, একটি উন্নত ও স্বচ্ছ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এই মুহূর্তে নীতিমালা সংস্কার করা জরুরি। এর পেছনে সুনির্দিষ্ট ও যুক্তিসঙ্গত কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. স্থানীয় ‘শিক্ষক সিন্ডিকেট’ ও জবাবদিহিতার অভাব-
একই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বা একই এলাকায় দীর্ঘদিন চাকরি করার সুবাদে অনেক শিক্ষক স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা বা ম্যানেজিং কমিটির সাথে গভীর সখ্যতা গড়ে তোলেন। এর ফলে বিদ্যালয়ে এক ধরনের অদৃশ্য ‘সিন্ডিকেট’ তৈরি হয়। এই সিন্ডিকেটের প্রভাবে অনেক শিক্ষক নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত না হয়েও পার পেয়ে যান। স্থানীয় সাধারণ মানুষ বা অভিভাবকেরা সব জেনেও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বা প্রভাবশালীদের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পান না। তিন বছর পর পর বদলির নিয়ম থাকলে এই স্থানীয় সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার কোনো সুযোগ থাকবে না।
২. পেশাদারিত্বের অবক্ষয় ও কোচিং বাণিজ্য-
নিজ এলাকায় পোস্টিং থাকার কারণে অনেক শিক্ষকের মূল মনোযোগ স্কুলের ক্লাসরুম থেকে সরে গিয়ে নিজস্ব পারিবারিক ব্যবসা, দলাদলি কিংবা প্রাইভেট-কোচিং বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তারা সরকারি চাকরিকে একটি ‘স্থায়ী ও নিরাপদ আয়ের উৎস’ মনে করে মূল দায়িত্ব অবহেলা করেন। তিন বছর পর পর ভিন্ন পরিবেশে বদলি করা হলে শিক্ষকদের মধ্যে নিয়মানুবর্তিতা ফিরবে এবং তারা পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধ্য হবেন।
৩. বদলি নীতিমালায় বৈষম্য দূরীকরণ-
বর্তমানে অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চল, চর বা হাওর এলাকার স্কুলে শিক্ষকের তীব্র সংকট থাকে। অন্যদিকে, শহর বা উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার স্কুলগুলোতে তদবিরের মাধ্যমে শিক্ষকেরা বছরের পর বছর অবস্থান করেন। ৩ বছর পর পর বাধ্যতামূলক বদলির নিয়ম চালু হলে দেশের সব অঞ্চলের স্কুলগুলো সমানভাবে দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষক পাবে, যা সামগ্রিক শিক্ষায় সাম্য আনবে।
৪. পার্শ্ববর্তী উপজেলায় নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা-
সচেতন মহলের জোরালো দাবি—প্রাথমিক শিক্ষকদের নিজ উপজেলায় নিয়োগ না দিয়ে পার্শ্ববর্তী উপজেলায় নিয়োগ দেওয়া উচিত। নিজ উপজেলায় চাকরি করার কারণে সামাজিক ও পারিবারিক নানা অনুষ্ঠানে সময় দিতে গিয়ে অনেকেই স্কুল ফাঁকি দেন। তাছাড়া স্থানীয় আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে প্রধান শিক্ষক বা ক্লাস্টার অফিসাররাও তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে দ্বিধাবোধ করেন। পার্শ্ববর্তী উপজেলায় নিয়োগ দিলে এই স্থানীয় প্রভাব খাটানোর সংস্কৃতি অনেকটাই কমে আসবে।
বিদ্যালয়ে পুরুষ শিক্ষকের বাধ্যবাধকতা ও জবাবদিহিতার সংকট-
নীতিমালা সংস্কারের পাশাপাশি সচেতন মহলের মতে, দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কমপক্ষে একজন করে পুরুষ শিক্ষক রাখা বাধ্যতামূলক করা জরুরি। অনেক বিদ্যালয়ে শুধু মহিলা শিক্ষক থাকায় পরিচালনা কমিটির সদস্য বা অভিভাবকেরা স্কুলের প্রশাসনিক বা একাডেমিক গাফিলতি নিয়ে কথা বলতে গেলে জটিলতার সম্মুখীন হন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সঠিক তদারকি বা জবাবদিহিতা চাইতে গেলে উল্টো ‘মানহানি’ বা মিথ্যা মামলার হুমকির সম্মুখীন হতে হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে বিদ্যালয়ে প্রশাসনিক ভারসাম্য ও চেইন অব কমান্ড বজায় রাখতে পুরুষ শিক্ষকের উপস্থিতি আবশ্যক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র: ময়মনসিংহে অনিয়ম ও নিরাপত্তা ঝুঁকি-
শিক্ষকদের এই স্থানীয় প্রভাব ও জবাবদিহিতাহীনতার এক ভয়ংকর চিত্র সম্প্রতি দেখা গেছে ময়মনসিংহের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। জানা যায়, ওই বিদ্যালয়ের একজন জমিদাতা সদস্য সকাল সাড়ে ১০টায় বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখেন যে, মোট আটজন শিক্ষকের মধ্যে মাত্র একজন শিক্ষক উপস্থিত রয়েছেন।
স্কুল ফাঁকি দেওয়ার এই চরম অনিয়মের বিষয়টি ওই সদস্য তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) অবহিত করেন। কিন্তু এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওই বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, যিনি স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রভাবশালী, নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। তিনি বহিরাগত কিছু সন্ত্রাসী ও স্থানীয় লোক জড়ো করে অভিযোগকারী জমিদাতা সদস্যের ওপর চড়াও হন এবং তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে মারধরসহ প্রাণনাশের হুমকি দেন। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, স্থানীয় এলাকায় পোস্টিং থাকার কারণে শিক্ষকেরা কতটা বেপরোয়া এবং আইন অমান্যকারী হয়ে উঠতে পারেন।
সচেতন মহলের অভিমত:
”সরকারি চাকুরিজীবীদের মধ্যে বিসিএস ক্যাডার বা ব্যাংকারদের যেমন নিয়মিত বদলি করা হয়, তেমনি প্রাথমিক শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া উচিত। একজন শিক্ষক যখন জানবেন যে তিনি একটি এলাকায় মাত্র তিন বছর থাকবেন, তখন তিনি কোনো অনৈতিক সিন্ডিকেট তৈরিতে জড়াবেন না, বরং নিজের সুনাম বজায় রাখতে পাঠদানে মনোযোগী হবেন।”
প্রাথমিক শিক্ষা হলো একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ার ভিত্তিপ্রস্তর। গুটি কয়েক শিক্ষকের উদাসীনতা, অনিয়ম এবং স্থানীয় প্রভাবের কারণে পুরো প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে না। তাই শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে, শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং একটি আধুনিক ও দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা গড়তে অবিলম্বে “তিন বছর পর পর বদলি” এবং “ভিন্ন উপজেলায় নিয়োগ”-এর দাবি আজ সময়ের বাস্তবসম্মত দাবি। প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে—এমনটাই প্রত্যাশা দেশের সচেতন নাগরিকদের।