ভাষা আন্দোলনের অন্যতম বীর সেনানী, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য সাবেক গণপরিষদ সদস্য (এমসিএ) শহীদ অ্যাডভোকেট ইমান আলীর ৫০তম শাহাদাৎ বার্ষিকী আজ।
১৯৭৪ সালের এই দিনে (৩০ জুলাই) ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ময়মনসিংহ সদরের শিকারীকান্দা এলাকায় স্বাধীনতা বিরোধী আততায়ীদের গুলিতে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন এই মহান নেতা।
আজ এই বীর মুক্তিসেনাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছে ময়মনসিংহবাসীসহ দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন। দিবসটি উপলক্ষ্যে ‘ভাষাসৈনিক বীরমুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ইমান আলী এমপি স্মৃতি পরিষদ’-এর উদ্যোগে স্মারক আলোচনা, পুষ্পস্তবক অর্পণ ও দোয়া মাহফিলসহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
অ্যাডভোকেট ইমান আলী ময়মনসিংহ সদরের ভাবখালী ইউনিয়নের চূড়খাই বাজার এলাকার পনঘাগড়া সরকার বাড়ীর সানুল্যা সরকারের পুত্র।
পারিবারিক সুশিক্ষা ও মূল্যবোধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ইমান আলী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর (LL.M.) ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে ময়মনসিংহ জেলা জজ আদালতে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাঁর জাতীয় রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ ঘটে। ময়মনসিংহে প্রথম শহীদ মিনার স্থাপনে তিনি অগ্রণী ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন।
পরবর্তীতে ১৯৬১ সালের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন,১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন,১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ৬-দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থেকে বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন।
রাজপথের আপসহীন লড়াইয়ের কারণে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের তীব্র রোষাণলে পড়ে তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে।
১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে তৎকালীন ময়মনসিংহ-১৪ আসন (পিই-১৫২, বর্তমান ময়মনসিংহ-৪ সদর আসন) থেকে বিপুল ভোটে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন তিনি।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে তিনি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ময়মনসিংহে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলনকারীদের মধ্যেও তিনি ছিলেন অন্যতম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রথম মূল সংবিধান প্রণয়নে গণপরিষদ সদস্য হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
রাজনীতির পাশাপাশি ময়মনসিংহ জেলা জজ আদালতের একজন প্রজ্ঞাবান ও সফল আইনজীবী হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি ছিল। একই সাথে তিনি সমাজসেবা ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ে শ্রমিক নেতা হিসেবে নিরলস কাজ করে গেছেন।
স্বাধীন বাংলার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান—উভয় নেতারই অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন এডভোকেট ইমান আলী ।
দলমত নির্বিশেষে ময়মনসিংহ অঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব।
১৯৭৪ সালের ৩০ জুলাই আততায়ীর বুলেটে এই অকুতোভয় দেশপ্রেমিকের জীবন প্রদীপ নিভে গেলেও স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।