ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ত্রিশাল পৌরসভার নজরুল অডিটোরিয়াম এলাকার এক ছোট হোটেলের কোণে, যখন ১২ বছরের কিশোর আরাফাত সিয়াম ক্ষুধার্ত ও বিষণ্ণ চোখে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন সমাজ তাকে হয়তো ‘পথশিশু’ ভেবে এড়িয়ে যেতে পারতো। কিন্তু হোটেল ব্যবসায়ী সবুজ মিয়া তাকে ফিরিয়ে দেননি। পরম মমতায় আগলে নিয়ে প্রমাণ করেছেন—রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বড় হতে পারে মানবতার বন্ধন।
আরাফাতের জীবন শুরু থেকেই ছিল কণ্টকাকীর্ণ। জন্মের পর থেকেই সে বাবার স্নেহবঞ্চিত,জীবনে কখনও বাবাকে দেখার ভাগ্য হয়নি তার। মা আকলিমা বেগম জীবিকার তাগিদে নারায়ণগঞ্জের আদি নিবাস ছেড়ে ত্রিশালের একটি গার্মেন্টসে কাজ করতেন। কিন্তু গত রমজান মাসে অভাব আর পারিপার্শ্বিক চাপে পড়ে এক কঠিন সিদ্ধান্ত নেন মা। নিজের সন্তানকে ত্রিশাল শহরে একা ফেলে রেখে অন্যত্র বিয়ে করে চলে যান তিনি। হঠাৎ একা হয়ে পড়া কিশোর আরাফাতের সামনে তখন কেবল অন্ধকার আর ক্ষুধার যন্ত্রণা।
গত মার্চ মাসে (২০২৬) ভবঘুরে অবস্থায় আরাফাত আশ্রয় নেয় ত্রিশাল নজরুল অডিটোরিয়াম কাম কমিউনিটি সেন্টারের সামনে অবস্থিত সবুজ মিয়ার হোটেলে। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার ভাগলপুর ছন্দেরগাও এলাকার সন্তান সবুজ মিয়া বর্তমানে পরিবার নিয়ে ত্রিশালে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। ক্ষুধার্ত শিশুটিকে দেখার পর তিনি তাকে কেবল খাবারই দেননি, দিয়েছেন নিজের ঘরে ঠাঁই।
সবুজ মিয়া(০১৩৪৫ ১০৬৮০৫) জানান, ছেলেটির অসহায়ত্ব তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। তিনি বলেন:
”শিশুটি যখন ক্ষুধার্ত অবস্থায় আমার দোকানে আসে, তার চোখের সেই অসহায় চাহনি দেখে আমি স্থির থাকতে পারিনি। আমার নিজেরও সন্তান আছে, তাই একে ফেলে দিতে পারিনি। এখন সে আমার পরিবারেরই একজন সদস্য। আমার সন্তানদের মতোই সে আদর-যত্নে বড় হচ্ছে।”
নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এই দৃষ্টান্ত বর্তমানে ত্রিশাল এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রে। স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবানরা যদি সবুজ মিয়ার মতো এভাবে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতেন, তবে কোনো শিশুকেই আর পথে পথে ঘুরতে হতো না।
সবুজ মিয়ার এই মানবিকতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের চরম সংকটে এখনো মানুষই মানুষের পাশে দাঁড়ায়। এক নিরাশ্রয় শিশুর জীবনে আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে সবুজ মিয়া আজ ত্রিশালের এক প্রকৃত মানবিক গল্পের নায়ক।
সবুজ মিয়ার ঘরে পরম মমতায় থাকলেও আরাফাতের শিশুমন এখনো খুঁজে ফেরে তার গর্ভধারিণী মাকে। তার একমাত্র আকুতি—মা যেন তাকে নিতে ফিরে আসেন। শত অবহেলার পরেও মায়ের কোলে ফেরার এক বুক আশা নিয়ে দিন গুনছে এই কিশোর।