ময়মনসিংহের তারাকান্দায় ১৫ বছরের এক কিশোর ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত একটি ‘গায়েবি’ অপহরণ মামলা নিয়ে এলাকায় চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মামলার এজাহারে যখন ছাত্রীকে ‘অপহৃত’ দাবি করা হয়েছে, বিদ্যালয়ের রেকর্ড বলছে সেই সময় কথিত ভিকটিম নিয়মিত বার্ষিক ও নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছিল। জালিয়াতি ও ১০ লক্ষ টাকা চাঁদা না পেয়ে এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ১৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে তারাকান্দা ইউনিয়নের গোপিনাথপুর এলাকার মো. মানিক মিয়ার ছেলে মো. তামিম আহমেদ ইফতু (১৫) ও তার পরিবার মিলে জনৈক হাছনা বেগমের নাবালিকা কন্যা ইতি আক্তারকে অপহরণ করে। বাদী দাবি করেছেন, ভিকটিম ১৯ নভেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর/২৫ পর্যন্ত নিখোঁজ ছিল।
তবে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। বকশিমুল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০ নভেম্বর ২০২৫ থেকে ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ওই ছাত্রীর বার্ষিক ও নির্বাচনী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষার প্রতিটি দিন সে সশরীরে উপস্থিত থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। প্রশ্ন উঠেছে—অপহৃত অবস্থায় একজন শিক্ষার্থী কীভাবে নিয়মিত স্কুলে এসে পরীক্ষা দিল?
আসামি ইফতুর পরিবার জানায়, ইফতু একজন দশম শ্রেণির ছাত্র এবং তার প্রকৃত বয়স ১৫ বছর। কিন্তু মামলায় তাকে ফাঁসাতে এবং আইনি জটিলতা বাড়াতে একটি এফিডেভিট জালিয়াতি করে তার বয়স ২০ বছর দেখানো হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভিকটিমের মামা হাবিবুর রহমান ও ছেলের দূরসম্পর্কের মামা মো. বাঁধন যোগসাজশ করে এই সাজানো ঘটনা তৈরি করেছেন।
অভিযোগ উঠেছে, মামলার আগে আপোষ-মীমাংসার নামে ইফতুর পরিবারের কাছে ১০ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। সেই টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় গত ২৮ ডিসেম্বর তারাকান্দা থানায় এই অপহরণ মামলা (নং ১৮, ধারা ৭/৩০) দায়ের করা হয়।
বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষার্থী ইফতু পুলিশের গ্রেফতার এড়াতে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, যার ফলে তার উজ্জ্বল শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ইফতুর বাবা মো. মানিক মিয়া বলেন, “আমার মেধাবী ছেলেকে ধ্বংস করার জন্য এই মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। আমরা প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত চাই।”
মিথ্যা মামলা ও হয়রানির প্রতিবাদে ইতিমধ্যে স্থানীয় কয়েকশ মানুষ গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে রেঞ্জ ডিআইজি ময়মনসিংহের নিকট নিরপেক্ষ তদন্তের আবেদন জানিয়েছেন। এলাকাবাসীর দাবি, মোবাইল কললিস্ট (CDR) এবং বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতা যাচাই করলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। তারা অবিলম্বে এই হয়রানিমূলক মামলা থেকে নিরপরাধ কিশোর ও তার পরিবারকে অব্যাহতির দাবি জানান।
আইনজীবীরা বলছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অপব্যবহার রোধে উচ্চ আদালতের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। এই মামলায় ভিকটিমের ১৬৪ ধারার জবানবন্দি এবং স্কুলের উপস্থিতির রেকর্ড পর্যালোচনা করলেই সত্য উদ্ঘাটিত হওয়া সম্ভব। যথাযথ তদন্ত ছাড়া এমন মামলা গ্রহণ করায় স্থানীয় সচেতন মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।